সকল মেনু

রাজশাহী সুগার মিল এলাকার আখ নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে নেওয়ার অভিযোগ

রাজশাহী সুগার মিল এলাকার আখ নাটোরের নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে নেওয়া হচ্ছে—এমন অভিযোগ উঠেছে। সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দুই সুগার মিল একসঙ্গে চালু না হওয়ায় কৃষকেরা বাধ্য হয়ে নিজ এলাকার বাইরে আখ বিক্রি করছেন। এতে একদিকে রাজশাহী সুগার মিল আখসংকটে পড়ছে, অন্যদিকে কৃষকদের বাড়ছে ভোগান্তি ও অনিশ্চয়তা।

রাজশাহী সুগার মিলের ইক্ষু ক্রয়কেন্দ্র রাজশাহীর বাঘা উপজেলার সুলতানপুর ও গড়গড়ি এলাকায় অবস্থিত। অপরদিকে পার্শ্ববর্তী নাটোরের নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের ইক্ষু ক্রয়কেন্দ্র রয়েছে দুড়দুড়িয়া ও নওপাড়া এলাকায়।

এ বিষয়ে রাজশাহী সুগার মিলের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম–সিপিই) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে যে আমরা নাকি তাদের এলাকার আখ ক্রয় করি। বিষয়টি সত্য নয়। প্রকৃত সত্য হলো—নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল আমাদের মিল খোলার অন্তত ২১ দিন আগে চালু হয়ে গড়গড়ি ও সুলতানপুর এলাকার আখ নিয়ে গেছে। অনুসন্ধান করলে বাস্তব চিত্র পাওয়া যাবে।”

সরেজমিনে গিয়ে অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া গেছে। একাধিক কৃষক জানান, তাঁদের আখ চাষের জমি মূলত রাজশাহীর বাঘা উপজেলার পদ্মা নদীর চরাঞ্চলে। রাজশাহী সুগার মিল দেরিতে চালু হওয়ায় মৌসুমি ফসল ক্ষতির আশঙ্কায় তাঁরা নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে আখ বিক্রি করতে বাধ্য হন।

সুলতানপুর ইক্ষু ক্রয়কেন্দ্রের সিআইসি নবাব আলী বলেন, “নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল আমাদের মিল খোলার অন্তত ২১ দিন আগে চালু হয়। এই সুযোগে আমাদের এলাকার অনেক কৃষক সেখানে আখ বিক্রি করে। এটা রোধ করার কোনো উপায় আমাদের নেই।”

গড়গড়ি ইক্ষু ক্রয়কেন্দ্রের সিআইসি আনিসুর রহমানও একই কথা বলেন।

তবে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের জিএম (প্রশাসন) আনিছুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “যাঁরা আমাদের মিলে আখ বিক্রি করেন, তাঁরা আমাদের সার্ভে করা কৃষক। কেউ আত্মীয়স্বজনের আখ নিজের নামে দেয় কি না, সে বিষয়টি আমাদের জানা নেই।”

নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের দুড়দুড়িয়া ইক্ষু ক্রয়কেন্দ্রে কর্মরত জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, “আমরা আমাদের এলাকার কৃষকদের আখ নিয়েই হিমশিম খাই। অন্য এলাকার আখ নেওয়ার প্রশ্নই আসে না।”

তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। সুলতানপুর এলাকার কৃষক সোলাইমান আলী বলেন, “আমাদের প্রাণের দাবি—দুটি সুগার মিল একসঙ্গে খুলতে হবে। এক মাস দেরি হলেই আমাদের বড় ক্ষতি হয়।”

একই এলাকার কৃষক আব্দুস সাত্তার বলেন, “আখ চাষে তেমন লাভ হয় না। অন্য ফসল করে পুষিয়ে নিতে হয়। মিল দেরিতে খুললে বাধ্য হয়ে অন্যের নামে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে আখ দিতে হয়—এটা খুব কষ্টের।”

সুলতানপুর এলাকার কৃষক বজলুল করিম (অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট) বলেন, “আমরা নদীমাত্রিক এলাকায় থাকি। বন্যায় ফসল ডুবে যায়। দুই মিল একসঙ্গে চালু হলে অন্তত ক্ষতিটা কিছুটা কমানো যেত।”

আজদার আলী নামের আরেক কৃষক জানান, আলু ও অন্যান্য ফসল চাষে দেরি হবে—এই আশঙ্কায় আত্মীয়স্বজনের সহায়তায় তিনি নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে এক বিঘা আখ বিক্রি করেছেন।

গড়গড়ি এলাকার কৃষক আরজেত আলী বলেন, “আমার সব জমিই রাজশাহী সুগার মিল এলাকায়। কিন্তু নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল আগে খোলায় অন্য নামে সেখানে আখ বিক্রি করেছি।” তিনি আখ বিক্রির বিলের কপিও দেখান।

নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের নওপাড়া এলাকার কৃষক আবু তালেব ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “একই করপোরেশনের অধীনে দুটি মিল। তাহলে কেন এক মাস পার্থক্য করে মিল চালু হয়? এই কারণেই এক এলাকার আখ অন্য এলাকায় ব্ল্যাক হয়ে যায়। যার বেশি কুশুর আছে সে মাসে দুইটা চিট পায়, যার নেই সে বঞ্চিত হয়—এটা অন্যায়।”

কৃষকদের অভিযোগ, মিল ব্যবস্থাপনার এই বৈষম্য ও সময়সূচির অসামঞ্জস্যের কারণেই আখের ‘ব্ল্যাক ট্রেড’ বাড়ছে এবং প্রকৃত কৃষকেরা ন্যায্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

সর্বস্তরের কৃষকদের একটাই দাবি—বাংলাদেশ সুগার অ্যান্ড ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের আওতাধীন রাজশাহী ও নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল একই সময় চালু করতে হবে। এতে কৃষকদের দুর্ভোগ কমবে, আখ পাচার বন্ধ হবে এবং মিল দুটির উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ফিরবে।

ফন্ট সাইজ:
0Shares

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

top