সকল মেনু

দুর্গাপুরে ৬ মাসে ৬ খুন-ছিনতাই-চুরি, আইনশৃঙ্খলা অবনতির শঙ্কা

চলতি বছরের গেল ছয় মাসে রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলায় একের পর এক খুন, ছিনতাই ও চুরির ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এসব ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ভীতি ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন তারা।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে আগস্ট ১৮ অন্তত ৬টি আলোচিত ঘটনায় দুর্গাপুর উপজেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। জনসাধারণের মাঝে এক ধরণের ভীতিকর অবস্থার তৈরি করেছে এই ঘটনাগুলো। ২২ ফেব্রুয়ারি শনিবার উপজেলার দেলুয়াবাড়ি ইউনিয়নের খিদ্রলক্ষীপুর গ্রামে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে দুপক্ষের সংঘর্ষে ফেরদৌসী বেগম নামের এক গৃহবধূ নিহত হন, ১৪ মার্চ রবিবার জয়নগর ইউনিয়নের আনুলিয়া গ্রামে যৌতুক না পেয়ে আফরিন আক্তার বৃষ্টি (২২) নামের এক গৃহবধূকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে, ১৪ এপ্রিল সোমবার দেলুয়াবাড়ী ইউনিয়নের আমগ্রাম গ্রামে এক নারীর অনশনকে কেন্দ্র করে বিএনপি কর্মী মকবুল হোসেন নামের এক যুবক খুন হন, ৪ জুন বুধবার ঝালুকা ইউনিয়নের হাড়িয়াপাড়া গ্রামে পূর্ব শত্রুতার জেরে জুয়েল রানা নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়, মাড়িয়া ইউনিয়নের হোজা অনন্তকান্দি গ্রামে জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে দুপক্ষের সংঘর্ষে হাসিবুর রহমান নামে এক যুবক নিহত হয়েছে, এই ঘটনার জের ধরে ১০ আগস্ট রবিবার ফের প্রতিপক্ষের হামলায় ওয়াজেদ আলী(৪৮) নামের এক ব্যক্তি খুন হয়েছেন।
এছাড়া ২৯ মে দুর্গাপুর-শিবপুর রাস্তা সংলগ্ন ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের সামনে এক নারী প্রভাষক সাবরিনার হাতব্যাগ ছিনতাই হয়েছে, ২২ জুন রোববার উপজেলার দেলুয়াবাড়ী ইউনিয়নের পাঁচুবাড়ী ও শ্রীধরপুর বাজারে ৮টি দোকানে দুর্ধর্ষ চুরির ঘটনা ঘটেছে।
উপজেলাব্যাপী ঘটতে থাকা ধারাবাহিক এসব ঘটনায় একদিকে এলাকায় যেমন চাঞ্চল্যের জন্ম দিয়েছে, অপরদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির চরম বার্তাও দিচ্ছে। সাধারণ ও সচেতন মানুষ এ নিয়ে উদ্বেগ ও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এমন উদ্ভুত পরিস্থিতিতে পুলিশ প্রশাসনকে আরো কার্যকর ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করার দাবি জানিয়েছেন উপজেলাবাসী। পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে যা যা করা দরকার সেসব পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান করেছেন তারা।
দুর্গাপুর ডিগ্রী কলেজের আইসিটি ল্যাব সহকারী নাসির উদ্দিন বাবু বলেন, আমরা উপজেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কিছুটা বিচলিত। চুরি, ডাকাতি ও খুনোখুনির ঘটনায় অতিষ্ঠ, এমন পরিস্থিতির উন্নতি চাই। আইনশৃঙ্খলার আরো উন্নতি দরকার বলে আমরা মনে করি।
দুর্গাপুর উপজেলা বিএনপির সদস্য জার্জিস হোসেন সোহেল বলেন, অল্প সময়ের মধ্যে এমন ধারাবাহিক অপরাধের ঘটনা আগে ঘটেনি। দ্রুত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এনে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) দুর্গাপুর উপজেলা শাখার সভাপতি নুরুল ইসলাম বলেন, চলতি বছরে উপজেলায় যে ধারাবাহিক খুন, ছিনতাই ও চুরির ঘটনা ঘটছে, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তিনি এসব ঘটনাকে সামাজিক অবক্ষয় হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, “৫ আগস্টের পরে যারা নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, তারা এখনো শক্ত অবস্থানে নেই। তাই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কিছুটা নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।”
নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “প্রত্যেকে যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন থাকে, তাহলেই এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধ করা সম্ভব।”
দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাবরিনা শারমিন দুর্গাপুরে ছিনতাই, চুরি ও খুনের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “এই ঘটনাগুলো প্রশাসনসহ সকলের জন্য উদ্বেগজনক। এ ধরনের ধারাবাহিক অপরাধের মূল কারণ কিছুটা সামাজিক অবক্ষয় এবং কিছুটা আইনশৃঙ্খলার অবনতি। অধিকাংশ ঘটনা পূর্ব শত্রুতা বা জমি-বিরোধকে কেন্দ্র করে ঘটছে।”
ইউএনও আরও বলেন, “এ ধরনের ঘটনা যাতে পুনরায় না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে আমরা নিয়মিত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা মিটিংয়ে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করি এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিই। এছাড়া, জনগণের মধ্যে ভয়-ভীতি কমাতে আমরা সবসময় তাদের পাশে আছি; সমস্যা জানালে তা গুরুত্ব সহকারে সমাধান করা হয়, যাতে বিশৃঙ্খলা না ঘটে।”
দুর্গাপুর থানার সাবেক ওসি দুরুল হোদার বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি (আজকে) থানায় নতুন ওসি যোগদান করেছেন মো: আতিকুল ইসলাম। নতুন ওসিকে সরকারি নম্বরে ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুঠিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. কুদরত-ই-খুদা শুভ বলেন, “এসব নিয়ে কথা বলার জন্য আমি উপযুক্ত ব্যক্তি নই। আমাদের মিডিয়া সেল আছে, আপনি জেলা পুলিশের মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।”
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “এ বিষয়ে জানতে চাইলে আপনি ক্রাইম শাখার এডিশনাল এসপি ৫০৩-কে ফোন দিতে পারেন।”
এরপর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) মো. শরিফুল ইসলামের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
পরবর্তীতে রাজশাহী পুলিশ সুপার (এসপি) ফারজানা ইসলামকে ফোন দিয়ে চলতি বছরের গেল ৬ মাসে দুর্গাপুরে ঘটে যাওয়া খুন, ছিনতাই ও চুরির ঘটনায় জনমনে সৃষ্ট উদ্বেগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি একটু স্ট্যাটিসটিক দেখে আপনাকে জানাচ্ছি।” তবে পরে আর ফোন রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠানো হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
ফন্ট সাইজ:
0Shares

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

top