জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে রাজশাহীতে সম্মুখসারিতে ছিলেন প্রফেসর ড. ইফতিখারুল আলম মাসউদ। ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের সংবাদ রাজশাহীর আন্দেলনরত শিক্ষার্থীদের সর্বপ্রথম তিনিই দেন। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আন্দোলনের পুরো সময় শিক্ষার্থীদের সাথে রাজপথে ছিলেন তিনি। আন্দোলনে অংশ নিয়ে আটক হওয়া শিক্ষার্থীদের থানা থেকে ছাড়ানো, রাজপথে বক্তব্য প্রদান, মিছিল ও মার্চ কর্মসূচিতে ছিলেন সম্মুখসারিতে।
গত বছরের ৫ আগস্টের রাজশাহীর চিত্র নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন প্রফেসর ড. ইফতিখারুল আলম মাসউদ। ওইদিনের রাজশাহীর অবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘৩৬ জুলাই বা হাসিনার পতন হঠাৎ করে হয়নি। গোটা জাতির আকাঙ্খা ছিল। সেই আন্দোলনে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অসামান্য ভূমিকা রেখেছে। আমরা ইতিহাসের একটা অংশ হয়েছিলাম। আমরা শিক্ষার্থীদের ন্যয়সঙ্গত দাবির সাথে ছিলাম। যতটুকু পেরেছি জাতির মুক্তির সংগ্রামে ভূমিকা রেখেছি। আন্দোলনে দেশজুড়ে হাসিনার গণহত্যা শুরুর পর ছাত্ররা রাজশাহী ছাড়েনি। তারা বিভিন্ন জায়গায় ছিল।’
প্রফেসর ড. ইফতিখারুল আলম মাসউদ বলেন, ‘৩১ জুলাই নতুন করে আন্দোলন শুরু হয়। সর্বস্তরের মানুষ একত্রিত হয়েছিল। ৩ তারিখ আমরা ভদ্রা স্টেশন হয়ে বিন্দুর মোড় পর্যন্ত মিছিল নিয়ে যাই। রাজশাহীতে ছাত্রদের দাবি ছিল, তারা জিরো পয়েন্ট যাবে। নগর ভবন সম্পর্কে ভয়াবহ তথ্য পাচ্ছিলাম। ৪ তারিখ তাদের ভদ্রা পর্যন্ত নিয়ে আসি। এরপর ৫ তারিখ তালাইমারি মোড়ে ছাত্রদের দাবি, যেকোনো মূল্যে তারা জিরো পয়েন্টে যাবে। কিন্তু আমার মন সাই দিচ্ছিল না। তবে নানারকম সংবাদ আসছিল ঢাকা থেকে। বড় কিছু হতে যাচ্ছে।’
ড. মাসউদ বলেন, ‘বেলা ১১টা পৌনে ১১টার দিকে ছাত্ররা দাবি তুলল। তারা বলল এখনই জিরো পয়েন্ট যাব। ফেলতে পারলাম না। আমরা জিরো পয়েন্টের উদ্দেশে রওনা দিলাম। আমি ও আমাদের বর্তমান ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর সালেহ হাসান নকীব স্যার একসাথে ছিলাম। কেমন জানি অজানা আশঙ্কা ছিল। আমরা তখন শাহ মখদুম কলেজের সামনে। আওয়ামী পেটুয়া বাহিনী গুলি ও বোমাবাজি শুরু করলো। নিরীহ মানুষের ওপর এভাবে আক্রামণ করবে আমরা ভাবতে পারিনি। তাদের পেছনে পুলিশ ছিল। আমরা একটু বাঁধের ওপর দিয়ে আসছিলাম। সালেহ হাসান নকীব স্যার আমাকে বললেন, না, মন টানছে না; রাজপথে নামো। হাদির মোড়ে আবারও রাজপথে নামলাম। সেখানেও পুলিশ ছিল। পুলিশ আমাদের চিনতে পারলো।’
প্রফেসর ড. মাসউদ আরও বলেন, ‘ওদিকে গুলি হচ্ছে। জিরো পয়েন্টের দিক থেকে আওয়ামী গুণ্ডাবাহিনী এগিয়ে আসছে। ছাত্ররা তালাইমারির দিকে থেকে জিরো পয়েন্টের দিকে। পুলিশ বলল, আমরা আপনাদের চিনি। আপনারা ছাত্রদের ঠেকান, আমাদের যেন মারমুখী হতে না হয়। গুলি চালিয়েই সন্ত্রাসীরা। আমাদের ধারণা গুলিতে অনেকেই শহীদ হয়েছে।’
শেষ সময়ের অবস্থা তুলে ধরে ড. মাসউদ বলেন, ‘হঠাৎ আমার কাছে ঢাকা থেকে ফোনে খবর আসলো, ফ্যাসিস্ট হাসিনা পালিয়েছে। আমি শিক্ষার্থীদের বললাম, তোমরা শান্ত হও, খুনিটা পালিয়েছি। সর্বপ্রথম আমারই সুযোগ হয়েছিল সুখবরটা দেওয়ার। সংবাদ শুনে অনেকেই আমাকে জড়িয়ে ধরলো আর বলল, স্যার সতি বলছেন স্যার? আমি বললাম, একদম সত্য ঘটনা। তখন অনেকেই সিজদায় লুটিয়ে পড়লো। কী যে আনন্দ ছিল! ওখান থেকে গোটা শহরে মুক্তির আনন্দ মিছিল শুরু। আমরা ইতিহাসের অংশ হলাম।’
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।