দেশের সবচেয়ে উষ্ণতম স্থান নাটোরের লালপুর উপজেলা আজ এক ভয়াবহ মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখে। একদিকে তীব্র দাবদাহ, অন্যদিকে অসহ্য লোডশেডিং আর জ্বালানি তেলের সংকট—এই ত্রিমুখী চাপে পিষ্ট হচ্ছে লালপুরের সাধারণ মানুষ। ১ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহের পর ২ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের যে চক্র বর্তমানে চলছে, তা কেবল জনজীবনকে বিপর্যস্তই করেনি, বরং ধস নামিয়েছে উপজেলার শিক্ষা, কৃষি এবং স্বাস্থ্য খাতেও।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে শিক্ষা ক্ষেত্রে। বর্তমানে দেশব্যাপী এসএসসি পরীক্ষা চলছে। লালপুরের পরীক্ষার্থীরা কেন্দ্রে প্রচণ্ড গরমে পরীক্ষা দিয়ে বাসায় ফিরেও শান্তিতে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে না। রাতের দীর্ঘ লোডশেডিং তাদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ও পরীক্ষার ফলাফলে। এমনকি শ্রেণিকক্ষের অসহ্য গরমে টিকতে না পেরে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের গাছের নিচে খোলা আকাশের নিচে পাঠদান করতে হচ্ছে। শিক্ষার এই আদিম দশা আধুনিক যুগে কোনোভাবেই কাম্য নয়।
লালপুরের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো কৃষি ও খামার। বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটে এই খাতটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় পোল্ট্রি খামারের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না, ফলে হিটস্ট্রোকে প্রতিনিয়ত মারা যাচ্ছে শত শত মুরগি। ছোট ও মাঝারি খামারিরা আজ নিঃস্ব হওয়ার পথে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তীব্র জ্বালানি তেল সংকট। বিদ্যুৎ না থাকায় সেচ পাম্প চালানো যাচ্ছে না, আবার তেলের অভাবে বিকল্প উপায়েও মাঠে পানি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে পানির অভাবে কৃষকের সোনালী ফসল মাঠেই শুকিয়ে যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য খাতের অবস্থাও শোচনীয়। প্রচণ্ড গরমে শিশু ও বৃদ্ধরা ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হচ্ছেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্যমতে, গত ১৫ দিনে রোগীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু হাসপাতালেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় ডাক্তারদের জরুরি চিকিৎসা সেবা প্রদানে চরম হিমশিম খেতে হচ্ছে।
এছাড়া চার্জার ভ্যান চালিয়ে যারা জীবিকা নির্বাহ করেন, তারা ভ্যান চার্জ দিতে না পারায় সম্পূর্ণ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে চলতে তাদের ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।
যদিও স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর সুপারিশে অতিরিক্ত ৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাওয়া গেছে, কিন্তু লালপুর উপজেলায় ১৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে এটি সাগরে এক ফোঁটা পানির মতো। তবে এই তিন মেগাওয়াট থেকে বাগাতিপাড়া উপজেলাকেও দেয়া হচ্ছে। জ্বালানি সংকটের দোহাই দিয়ে একটি জনপদকে এভাবে দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগে রাখা কোনো টেকসই সমাধান হতে পারে না।
আমরা মনে করি, লালপুরের এই সংকট এখন কেবল বিদ্যুৎ বিভাগের নয়, বরং একটি জাতীয় সমস্যা। কৃষি, শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এখানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়ানো জরুরি। নতুবা এই অর্থনৈতিক ও মানবিক বিপর্যয় ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে। প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের দাবি—দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে লালপুরবাসীকে এই অসহ্য ‘নরক যন্ত্রণা’ থেকে মুক্তি দিন।
লেখক: সাংবাদিক
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।