বাংলাদেশবেলা
প্রকাশিত: ২৮ মে, ২০২৫, ১২:৩৭ অপরাহ্ণ

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে ইতিহাস গড়েছে

লেখক: ইউনুস সুজন
পাহাড় -অরণ্যে ঘেরা লালামাটির পাদদেশে অবস্থিত প্রচীন এক শিক্ষা নগরীর নাম কুমিল্লা। ইতিহাস ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক হিসেবে ধরা হয় এই কুমিল্লাকে। প্রচীন শালবন বিহার, ময়নামতি জাদুঘর, রুপবন মুড়া দৃশ্যমান থাকলেও মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে আর নানান ঘুমন্ত ইতিহাস, সেই ইতিহাসের শেষ অব্দে দাড়িয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। ২৮ মে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস।  অন্য যেকোনো দিবসের মতো নয়, এই দিনটি কুবিয়ানদের জন্য এক আনন্দ, আত্মত্যাগ, এবং সংগ্রামের দিবস। কারণ এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু জ্ঞান চর্চার জায়গা নয়, বরং  গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের এক অবিস্মরণীয় মাইলফলকের চিহ্ন এই বিশ্ববিদ্যালয়।
ইতিহাস বলে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছাত্রজনতা কোটা আন্দোলনের জন্য  রাস্তায় নেমেছিল, তখন কুবিয়ানরাও আন্দোলনের সাথে একাত্মতা পোষণ করে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে কিন্তু প্রথম পুলিশি হামলার স্বীকার হয় এই কুবিয়ানরাই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংলগ্ন আনসার ক্যাম্পের সামনে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনরত ছাত্রদের উপর বর্বরভাবে হামলা চালায় পুলিশ। ইতিহাস সাক্ষী রাখে, এটাই ছিল সেই প্রথম আক্রমণ, যেখান থেকে আন্দোলনের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ এভাবে সারা দেশে  ছড়িয়ে পড়ে, শুরু হয় সারা দেশের প্রতিবাদের আগুন। স্লোগান উঠে, “কুবিতে হামলা কেন, প্রশাসন জবাব চাই। ” প্রতিধ্বনিত হয় “বুকের ভেতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর”
এই আন্দোলন থেকে শিক্ষার্থীদের যে প্রেরণা তৈরি হয়, তা আর থেমে থাকেনি,তাৎক্ষণিক আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে দেশদেশান্তরে। কুবির ছাত্রদের রক্ত, সাহস আর আওয়াজ হয়ে উঠেছিল সারাদেশের প্রতিবাদের প্রাথমিক স্পার্ক। তখন দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একে একে রাস্তায় নামতে শুরু করে, আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে, শুরু হয়ে যায় গণজাগরণ, এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে, কোটা আন্দোলন থেকে নয় দফা এরপর এক দফার ঘোষণা, অতঃপর এক নয়া বৈষম্যহীন বাংলাদেশের সূচনা,  এর সকল কিছুর প্রেক্ষাপট বা কেন্দ্রবিন্দু ছিল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, আজ অনেক নানান আলোচনা সমালোচনা থাকলেও কিন্তু ইতিহাসে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হওয়া প্রতিরোধ সবসময় আলাদা জায়গা নিয়ে থাকবে।
এ আন্দোলনে আমাদের হারাতে হয় একজন অমূল্য রত্ন শহীদ আব্দুল কাইয়ুমকে। তিনি কুবিয়ানদের এক অনুপ্রেরণার নাম, তিনি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সাহসী সন্তান, যিনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বুকের রক্ত দিয়ে আমাদের ইতিহাসকে রাঙিয়ে দিয়েছেন, ৫ই আগষ্ট বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেন সাভারের বুকে, তিনি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র শহীদ।
কুবি আজকের এই বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে যখন উদযাপনে মেতে উঠবে, তখন আমাদের উচিত এই শহীদ সন্তানের আত্মত্যাগকে স্মরণ করা, আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে লালন করা।
পুলিশের প্রথম হামলার দৃশ্য, ছাত্রীদের কান্না, রক্তাক্ত ছাত্রনেতারা- এইসব দৃশ্য তখন সারাদেশে ছড়িয়ে  পড়ে বিভিন্ন মাধ্যমে। কুবি শিক্ষার্থীদের সাহসিকতা, প্রতিরোধ আর সুসংগঠিত জনবল তখন জাতিকে নাড়িয়ে দেয়। এই জায়গা থেকেই জন্ম নেয় একটি প্রশ্ন  “কীভাবে এক ছোট বিশ্ববিদ্যালয় এত বড় একটি গণজাগরণের সূচনা করতে পারে?”
উত্তর খুব স্পষ্ট:
কারণ এখানে আছে গর্জে ওঠার সাহস, কিছু নবীন বীর এবং ইতিহাস গড়ার মানসিকতা। আজকের কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় স্বপ্নের পথে এক সংগ্রামী প্রতিষ্ঠান, আজ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শুধুমাত্র একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি একটি প্রতীক, যে প্রতিক একটি প্রজন্মের সাহস, অধিকার আদায়ে আপোষহীন , এবং শহীদের রক্তে লেখা গৌরবময় ইতিহাসের প্রতীক হিসেবে লিখিত থাকবে আজন্মকাল।
বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে যখন চারপাশে আলোকসজ্জা, র‍্যালি ও সাংস্কৃতিক আয়োজন চলবে, তখন একটিবারের জন্য হলেও থেমে স্মরণ করা উচিত সেই দিনগুলিকে ,যে দিনগুলোতে রক্ত ঝরেছে, প্রতিবাদ হয়েছে, আর জন্ম নিয়েছে একটি ইতিহাস। যে ইতিহাসের নাম জুলাই গণঅভ্যুত্থান।
কুবি এখন শুধু জ্ঞানচর্চার জায়গা নয় বরং কুবি একটি চেতনার নাম, একটি সংগ্রামের নাম এবং একটি ইতিহাসের নাম, আর এই ইতিহাস আমরা গর্ব করে বহন করি ;আগামী প্রজন্মের জন্য, শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে, এবং ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় থাকার অঙ্গীকার নিয়ে।

সম্পাদক: মো: জামিরুল ইসলাম

প্রকাশক: রেজাউল করিম শামীম

QR Code

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

আপনার মোবাইল দিয়ে এই QR কোডটি স্ক্যান করে বিস্তারিত খবরটি অনলাইনে পড়ুন।

https://www.bangladeshbela.com/2025/05/28/education/newsid-7843/

© বাংলাদেশবেলা | প্রিন্ট/ডাউনলোড: ২১-০৪-২০২৬, ০৪:৪৯ অপরাহ্ণ